News

পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রি করেছে ৩৫.৩৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে ১২.৩৩ বিলিয়ন
10 May 2026
Source: Bonik Barta

সে হিসাবে পাঁচ বছরের ব্যবধানে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর এ সময় বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে প্রায় ১২ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন বা ১ হাজার ২৩৪ কোটি ডলার কিনেছে। বিপরীতে একই সময়ে বাজারে ৩৫ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রি করেছে। সে হিসাবে পাঁচ বছরে রিজার্ভ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিট ডলার বিক্রি হয় প্রায় ২৩ বিলিয়ন। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত‌“‘ফরেক্স মার্কেট অ্যান্ড রিজার্ভ ম্যানেজমেন্ট রিপোর্ট ফর ফিসক্যাল ইয়ার ২০২৪-২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে অবশ্য উঠে আসে, দেশ থেকে সর্বাধিক অর্থ পাচার হয় কভিড-পরবর্তী সময়ে। আর সেটি হয়েছে ব্যাংক খাত ব্যবহার করেই। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৮৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি দেখানো হয়। ডলারের তীব্র সংকটের পেছনে এ রেকর্ড পরিমাণ আমদানিকেই দায়ী করা হয়।

তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, ওই সময় আমদানির আড়ালে মূলত বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে বিদেশে। ইসলামী ব্যাংকসহ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলো সবচেয়ে বেশি লুণ্ঠনের শিকার হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত জনতাসহ অন্য ব্যাংকগুলো ব্যবহার করেও পাচার হয়েছে অর্থ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বিক্রি করা ডলারের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, গত পাঁচ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংক মোট ১ লাখ ৫৮ হাজার ১০৯ কোটি টাকার নিট মুনাফা করেছে। এর বৃহৎ অংশই এসেছে ডলার বেচাকেনার মাধ্যমে। ব্যাংকগুলো থেকে কম দামে কেনা ডলার পরবর্তী সময়ে বেশি দামে বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় ডলারের অসমন্বিত (অবিক্রীত) দরও প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। আর এ প্রক্রিয়াই নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুনাফা বাড়ার অন্যতম বড় কারণ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিষয়টিকে অবশ্য কেবল ‘লাভ’ দিয়ে বিচার করলে পুরো বাস্তবতা ধরা পড়ে না বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত বৈদেশিক মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং আমদানি দায় মেটানোর জন্য ডলার কেনাবেচা করে। কিন্তু যখন দীর্ঘ সময় ধরে টাকার অবমূল্যায়ন হয় এবং সে প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল হিসাবভিত্তিক মুনাফা তৈরি হয়, তখন জনগণের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়—নীতিসিদ্ধান্তগুলো কতটা বাজার বাস্তবতার জন্য, আর কতটা আর্থিক সুবিধার কারণে। কেননা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মুনাফার বিপরীতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যদ্রব্যের বাড়তি দামের চাপ বহন করতে হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টাকার অবমূল্যায়নের সরাসরি আর্থিক সুবিধাভোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই অন্যতম। তবে এটিকে একমাত্র বা উদ্দেশ্যমূলক সুবিধাভোগী বলা অতিসরলীকরণ হবে। বাস্তবে সরকারও বেশি টাকায় রেমিট্যান্স ও রফতানি আয়ের সুবিধা পেয়েছে, রফতানিকারকরা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পেয়েছেন। আবার একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর শিল্প ও সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

সেলিম রায়হান আরো বলেন, ‘মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—এ অবমূল্যায়ন অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ও জনগণের কল্যাণে কতটা কার্যকর ছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা থেকে জনগণ শেষ পর্যন্ত কী উপকার পেয়েছে। সবশেষে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা যদি জনগণের অর্থনৈতিক কষ্ট কমাতে, বাজার স্থিতিশীল করতে এবং আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে কার্যকরভাবে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে এটি সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক সাফল্য হিসেবে নয়, বরং টাকার ক্রয়ক্ষমতা হারানোর প্রতীক হিসেবেই দেখা হবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৭৯৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার কিনেছিল। ওই সময় বিক্রি করা হয়েছিল মাত্র ২৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার। তখন প্রতি ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৪ টাকা ৮১ পয়সা। ওই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা হয়েছিল ৫ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। তবে পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে। কভিড-পরবর্তী বৈশ্বিক অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও ডলার সংকটের মধ্যে বাজারে ব্যাপক হস্তক্ষেপ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই অর্থবছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বিক্রি করে ৭৬২ কোটি ১৭ লাখ ডলার। বিপরীতে কেনে মাত্র ২১ কোটি ডলার। একই সময় ডলারের বিনিময় হার বেড়ে দাঁড়ায় ৯৩ টাকা ৪৫ পয়সায়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বেড়ে হয় ২৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক কর্তাব্যক্তিদের মতে, ২০২১ সালের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে তুলনামূলক কম দামে ডলার কিনে রিজার্ভ করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই ডলারই অনেক বেশি দামে বাজারে বিক্রি করে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন থেকেই বড় অংকের মুনাফা তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ মুনাফা কোনো উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে আসেনি, বরং এসেছে বিনিময় হার পরিবর্তন ও সংকট পরিস্থিতি থেকে।

বাজারে সংকট থাকায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ডলার বিক্রি আরো বাড়িয়ে ১ হাজার ৩৫৭ কোটি ৮২ লাখ ডলারে উন্নীত করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই সময়ে প্রতি ডলারের বিনিময় হার বেড়ে ১০৬ টাকায় পৌঁছে। একই অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকায়, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

পরের অর্থবছরেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বড় বিক্রেতা হিসেবেই অবস্থান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিক্রি করা হয় ১ হাজার ২৭৯ কোটি ৮৮ লাখ ডলার। বিপরীতে ৩৩৮ কোটি ২৯ লাখ ডলার কেনা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ওই সময়ে বিনিময় হার বেড়ে দাঁড়ায় ১১৮ টাকা। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা হয় ৪০ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা।

সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডলার বিক্রি কমে ১১১ কোটি ৮৬ লাখ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে কেনা হয় ৬১ কোটি ৫২ লাখ ডলার। তবে বিনিময় হার আরো বেড়ে ১২২ টাকা ৭৮ পয়সায় উন্নীত হয়। ওই অর্থবছরেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৯৬২ কোটি টাকায়। এ মুনাফা থেকে গত পাঁচ বছরে সরকারি কোষাগারে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা জমা দেয়া হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ডলার বিক্রির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একদিকে বিপুল পরিমাণ টাকা বাজার থেকে তুলে নিয়েছে, অন্যদিকে একই সময়ে ব্যাংকগুলোকে উচ্চসুদে তারল্য সহায়তা দিয়েছে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সুদ আয়ও বেড়েছে। তাদের ভাষায়, এক হাতে ডলার বিক্রি করে টাকা তুলে নেয়া হয়েছে, আরেক হাতে সে টাকাই আবার ধার দেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলোকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ডলারের বিনিময় হারে অস্থিরতা তৈরি হলে ২০২৩ সালে বেশকিছু বাণিজ্যিক ব্যাংককে জরিমানা করা হয়েছিল। বেশি দামে ডলার বেচাকেনার অভিযোগেই ওই সময় জরিমানা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আসলে ২০১৭-১৮ সালের দিকেই বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারের ওপর ছেড়ে দিলে অর্থনীতি উপকৃত হতে পারত। তখন বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ডলারের দরে সমন্বয় হতো। কিন্তু জোর করে অনেক দিন ডলারের বিনিময় হার চাপিয়ে রাখার কারণেই ২০২২ সালে এসে এতটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়। এক্ষেত্রে দেশ থেকে টাকা পাচার বেড়ে যাওয়ার বিরূপ প্রভাবও ছিল।’

সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের বিনিময় হার স্থিতিশীল রয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো সংবাদ। তবে রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স ইতিবাচক ধারায় না থাকলে বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখা কঠিন। কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলসহ ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ায় আমাদের আমদানি ব্যয় বেড়েছে। আবার এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতিও নানা সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। পরিস্থিতি উত্তরণে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

অবশ্য ব্যবসার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এত পরিমাণ মুনাফা করেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসার উদ্দেশ্যে কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করে না। দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্বার্থেই আমরা বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিই। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে গত পাঁচ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা বাজার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার কিনেছি, আবার বাজারের প্রয়োজনে বিক্রিও করেছি। আর এর মধ্য দিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা অর্জিত হয়েছে। গত প্রায় দেড় বছর ধরে আমরা ডলার কিনছি। আগামীতে প্রয়োজন হলে আবার বিক্রিও করতে হতে পারে। এগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব ও কাজেরই অংশ।’